ব্রেন টিউমার

এই পোস্টে পড়ুন: English العربية Русский Uzbek 'তে

ব্রেন টিউমার কি?

ব্রেইন টিউমার হল একটি মেডিকেল অবস্থা যা মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে গঠিত পিণ্ড বা ভর দ্বারা সৃষ্ট হয়। আমাদের শরীরের কোষগুলি ক্রমাগত সংখ্যাবৃদ্ধি এবং বৃদ্ধি পাচ্ছে, পুরানো, বিদ্যমান কোষগুলিকে নতুন দিয়ে প্রতিস্থাপন করছে। মস্তিষ্কের টিউমারের ক্ষেত্রে, মস্তিষ্কের কোষগুলি একটি অনিয়ন্ত্রিত উপায়ে সংখ্যাবৃদ্ধি এবং বিভাজন শুরু করে যা স্বাভাবিকভাবে শরীর দ্বারা স্বীকৃত হয় না। এই দ্রুত কোষের সংখ্যাবৃদ্ধি স্বাভাবিক কোষের প্রতিক্রিয়ার চেয়ে ভিন্ন যা প্রাথমিকভাবে কেন এই কোষগুলি দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনার ঝুঁকি রাখে।

আনুমানিক 130 টি ব্রেন টিউমারের ধরন রয়েছে যা কোষের গুণনের ধরন, নির্দিষ্ট অবস্থান যেখানে কোষের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটে এবং কত দ্রুত তারা সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারে তার উপর ভিত্তি করে সনাক্ত করা হয়েছে।

মস্তিষ্কের কোষের দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি ধীরে ধীরে সুস্থ মস্তিষ্কের কোষগুলিকে ধ্বংস করতে শুরু করে এবং অস্বাভাবিকভাবে বিভাজিত কোষের বিস্তার একটি প্রাথমিক কারণ হিসেবে পরিচিত যে কারণে গুনগত কোষে প্রাথমিকভাবে গঠিত ক্যান্সারের অবস্থা সময়ের সাথে সাথে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কিভাবে অপ্রাকৃতিক কোষ গুণন মস্তিষ্ক প্রভাবিত করে

মস্তিস্ক একটি নরম, মশলাদার, পেশী যা ভিতরে ঢোকে এবং শক্ত মাথার খুলি দ্বারা সুরক্ষিত। এই ধরনের সীমিত জায়গায় দ্রুত কোষের সংখ্যাবৃদ্ধি, অসীম বৃদ্ধি এবং অসীম বৃদ্ধির সাথে সাথে অসীমভাবে বেড়ে ওঠা কোষগুলি মস্তিষ্কের সুস্থ কোষগুলিকে ধ্বংস করতে শুরু করে যা মৌলিক কার্যকারিতা এবং আবেগের জন্য দায়ী। এটি মস্তিষ্কের ক্ষতি বা মস্তিষ্ক-মৃত ঝুঁকির দিকে পরিচালিত করে। সীমাবদ্ধ স্থানে বহুগুণ বৃদ্ধির ফলে মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয়, ব্রেন টিউমারের রোগীদের প্রায়ই মস্তিষ্কের ক্ষতি বা সম্পূর্ণ বা আংশিক মস্তিষ্কের পক্ষাঘাতের প্রাথমিক কারণগুলির মধ্যে একটি।

ব্রেন টিউমারের কারণ

ব্রেন টিউমারের সঠিক কারণ নির্ধারণ করা এখনো পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। তবে সাধারণ ভাবে, নিম্নলিখিত বিষয়গুলিকে ব্রেন টিউমারের উল্লেখযোগ্য কারণ বলে মনে করা হয়:

পারিবারিক ইতিহাস ও বংশগতি

ব্রেন টিউমারের মত রোগ বা শারীরিক ব্যাধি অনেক ক্ষেত্রেই জিনগতভাবে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। এই কারণে, যদি আপনার পরিবারের কারোর ব্রেন টিউমারের ইতিহাস থেকে থাকে, অর্থাৎ পূর্বে কেউ এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে থাকে, তবে আপনারও ব্রেন টিউমার হবার সম্ভাবনা থাকে। আমাদের দেহের কোষগুলি অসংখ্য ডি এন এ দ্বারা গঠিত। এই ডি এন এ, অর্থাৎ ডাই-রাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড হলো এক ধরণের রাসায়নিক যৌগ যা আমাদের জিনের গঠনে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। ওই জিন দ্বারাই আমাদের দেহকোষের কার্যকলাপ নির্ধারিত হয়। যদি কোষের অভ্যন্তরে ডি এন এ-র কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দেয়, তার ফলস্বরূপ আমাদের দেহের কোষগুলি অনিয়ন্ত্রিতভাবে এবং অস্বাভাবিক ভাবে বিভাজিত হতে শুরু করে।

মানবদেহে প্রধানতঃ দুই ধরণের জিন পাওয়া যায়:

  • অঙ্কোজিন, যা কোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিভাজনে প্রধান ভূমিকা পালন করে
  • টিউমার সাপ্রেসর জিন বা টিউমার নিয়ন্ত্রণকারী জিন, যা উপস্থিত কোষগুলির বৃদ্ধি ও বিভাজন নিয়ন্ত্রণ করে। এই জিনগুলি দেহে বর্তমান কোষগুলিকে ধ্বংস করতে সাহায্য করে, যার ফলে নতুন, সুস্থসবল কোষ জন্মাতে পারে।

এই অঙ্কোজিন বা টিউমার সাপ্রেসর জিনের মধ্যে কোনো একটি যদি কাজ না করে, তবে শরীরের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয় এবং তার ফলে ব্রেন টিউমার বা অন্যান্য ক্যান্সারের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।

পূর্বতন রোগ ব্যাধির ইতিহাস

যদি আপনি ইতিপূর্বে কোনো রকম ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তবে আপনার ব্রেন টিউমার হবার সম্ভাবনা অনেক গুণ বেড়ে যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, আমাদের শরীরে ক্যান্সার কোষগুলি দীর্ঘকাল যাবৎ সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে, এবং বহুকাল পরেও তা হঠাৎ প্রতিক্রিয়া করতে পারে। এই কারণেই, পূর্বে ক্যান্সার থাকা পরবর্তীতে ব্রেন টিউমার না অন্যান্য প্রকার ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ক্যান্সার কোষের দ্রুত ও অস্বাভাবিক বিভাজন হবার একটি উল্লেখযোগ্য শর্ত হিসেবে পরিগণিত হয়। এবং এই একই কারণে, দীর্ঘকাল পূর্বের সুপ্ত অবস্থায় থাকা ক্যান্সার পুনরায় দেহে প্রতিক্রিয়া ঘটাতেও সক্ষম হয়। যদি কোনো ব্যক্তি পূর্বে লিউকিমিয়া অর্থাৎ রক্তের ক্যান্সার বা নন-হজকিন্স লিম্ফোমায় আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তবে পরবর্তীকালে, পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় তার ব্রেন টিউমার হবার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। এর সাথে সাথেই, শৈশবে কোনোরূপ ক্যান্সার থাকাও পরবর্তী কালে ব্রেন টিউমারের উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

রেডিয়েশনের সংস্পর্শে আসা

বারংবার রেডিয়েশন অর্থাৎ উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বিকিরণের সংস্পর্শে আসার ফলে ব্রেন টিউমারের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পায়। পেশাগত কারণে কাজের জায়গার পরিবেশে বিকিরণকারী রশ্মির উপস্থিতির ফলে, অথবা ক্যান্সারের চিকিৎসার অংশ হিসেবে কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন থেরাপি জাতীয় চিকিৎসার প্রভাবেও এই ঝুঁকি বাড়তে পারে। এমনকি সিটি স্ক্যান বা এম আর আই জাতীয় ইমেজিং টেস্ট বারবার করানোর ফলেও রেডিয়েশনের ঝুঁকি থেকে যায়।

উপরিউক্ত রেডিয়েশনের উদাহরণগুলি ছাড়াও এমন কিছু ক্ষেত্র রয়েছে, যার দ্বারা আমরা সকলেই কম বেশি প্রভাবিত। মোবাইল এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ হলো এমন দুটি ক্ষেত্র যা থেকে সবসময়ই রেডিয়েশনের ঝুঁকি থাকে। এই মোবাইল এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ (পাওয়ার লাইন) থেকে এক ধরণের আয়ন-বিহীন বিকিরণ বা রেডিয়েশন হয়, যা এক্স রে বা এম আর আই ইত্যাদির তুলনায় মৃদু ক্ষমতাসম্পন্ন হলেও তাতে রেডিয়েশনের প্রভাব একইরকম থাকে। বারংবার এই সমস্ত জিনিসের সংস্পর্শে আসা আমাদের শরীরে ব্রেন টিউমারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা

দেহের স্বভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে নানা রকম রোগ ব্যাধি দেখা দিতে পারে, যার ফলে ব্রেন টিউমার হবার সম্ভাবনা অনেক গুণ বেড়ে যায়। একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে যেসব ব্যক্তি এইডস বা এইচ আই ভি রোগে আক্রান্ত, সাধারণের তুলনায় তাঁদের ব্রেন টিউমার হবার ঝুঁকি অনেক বেশী।

বয়স

যদিও ব্রেন টিউমার হবার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই, তা সত্ত্বেও চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ ও সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রেন টিউমারের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়।

ওবেসিটি বা স্থূলতা

বিরল হলেও দেহে অতিরিক্ত মেদবৃদ্ধি বা স্থূলতা ব্রেন টিউমারের একটি উল্লেখযোগ্য কারণ বলে বিবেচিত হয়। প্রতি বছর গড়ে ২ শতাংশ মানুষ এই স্থূলতার কারণে ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হন। এবং সাধারণত পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি মাত্রায় লক্ষ্য করা যায়।

ব্রেন টিউমারের লক্ষণ ও উপসর্গ

ব্রেন টিউমার মূলতঃ দুই প্রকার হয়, ম্যালিগন্যান্ট অর্থাৎ ক্যান্সারের সম্ভাবনা যুক্ত এবং বিনাইন অর্থাৎ ক্যান্সারের সম্ভাবনা বিহীন। টিউমারের এই প্রকৃতি তার অবস্থান, আকার, ছড়িয়ে পড়ার হার এবং ক্যান্সার কোষগুলির বিভাজনের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই ব্রেনের টিউমার প্রাথমিক অবস্থায় ধরা যায়না, বা এর কোনো উপসর্গ দেখা যায়না। কিন্তু বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই ব্রেন টিউমারের কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষণ ও উপসর্গ লক্ষ্য করা যায়, যার দ্বারা সহজেই এই রোগ চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।

এই রোগের উপসর্গগুলি সাধারণ এবং সুনির্দিষ্ট এই দুই ধরনেরই হতে পারে।

ব্রেন টিউমারের সাধারণ উপসর্গের ক্ষেত্রে টিউমারটি ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে মস্তিষ্কন সুষুম্নাকাণ্ডে (মেরুদণ্ডের ভিতরে) প্রবল চাপের সৃষ্টি করে, এবং ফলস্বরূপ ব্রেন টিউমারের সাধারণ লক্ষনগুলির সৃষ্টি হয়।

অন্যদিকে, ব্রেন টিউমারে সুনির্দিষ্ট লক্ষণ দেখা যাওয়ার প্রধান শর্ত হল মস্তিষ্কের কোনো বিশেষ অংশ গভীরভাবে ক্যান্সারের দ্বারা প্রভাবিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। এই প্রভাবের ফলে ওই নির্দিষ্ট অংশে রোগের উপসর্গগুলি বারংবার দেখা দিতে থাকে।

এই দুই ধরণের উপসর্গ নিরূপণ করার জন্যই নির্দিষ্ট পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়। এবং এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মস্তিষ্কে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় টিউমার উপস্থিত রয়েছে কিনা, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।

ব্রেন টিউমারের সাধারণ উপসর্গ

মাথা ব্যথা

এই অসুবিধা ব্রেন টিউমারের একটি অতি পরিচিত উপসর্গ। প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রেই রোগের প্রাথমিক অবস্থায় এই উপসর্গ লক্ষ্য করা যায়। টিউমার আকারে বৃদ্ধি পেলে তা মস্তিষ্ক এবং পার্শ্ববর্তী স্নায়ু ও রক্তজালিকাগুলিতে প্রবল চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে এই ব্যথার অনুভব হয়। অনেক ক্ষেত্রেই রোগী তার মাথা ব্যথার ধরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়:

  • সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর তীব্র মাথা ব্যথা অনুভব করা
  • সারাদিন ধরে মাথা ব্যথা থাকা, কিন্তু দিনের বিভিন্ন সময়ে তার তীব্রতার পরিবর্তন লক্ষ্য করা
  • ব্যায়াম করার সময়, বেশি নড়াচড়া করলে বা কাশলে বেশি ব্যথা অনুভব করা
  • অতিরিক্ত মাথা ব্যথার কারণে বিভিন্ন উপসর্গ যেমন বমি ভাব অনুভব করা
  • সাধারণ ব্যথার ওষুধ খাওয়া সত্বেও মাথা ব্যথা না কমা

 

মনে রাখবেন, যে কোনো ধরণের মাথা ব্যথাই কিন্তু ব্রেন টিউমারের উপসর্গ নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, বেশি রাত পর্যন্ত জেগে থাকা, স্ট্রেস বা মানসিক চাপ ইত্যাদির কারণেও মাথা ব্যথা হতে পারে। যদি দীর্ঘদিন ধরে মাথা ব্যথা না কমে, তবে অবিলম্বে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিৎ।

ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন

ব্রেন টিউমারের ফলে হঠাৎ করে মেজাজ খারাপ হওয়া, এমনকি আপনার ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এই সংক্রান্ত যে সমস্ত পরিবর্তন সর্বাধিক দেখা যায়, সেগুলি হলো:

  • ছোটখাটো, সাধারণ বিষয়ে বিরক্তি অনুভব করা, এবং এই বিরক্তি ভাব দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হওয়া
  • বাইপোলার মুড চেঞ্জ, অর্থাৎ কোনো উল্লেখযোগ্য কারণ ছাড়াই এক মুহূর্ত হাসিখুশি অবস্থা থেকে পরমুহূর্তেই দুঃখ বা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়া
  • ক্লান্তি, কাজ করতে গড়িমসি ভাব, অথবা রোজকার কাজ করতে অনীহা
  • কোনো কাজ, যা পূর্বে আপনার প্রিয় ছিল, বর্তমানে তার প্রতি কোনো টান বা ঝোঁক না থাকা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আপনি হয়তো আপনার প্রিয় শখ বা হবিকেই ঘৃণা করতে শুরু করতে পারেন।
  • ছোটখাটো, সাধারণ বিষয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেওয়া

 

নিম্নলিখিত অঙ্গ বা দেহাংশে টিউমারের উপস্থিতির ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন দেখা দেওয়ায় সম্ভাবনা সর্বাধিক:

  • ফ্রন্টাল লোব বা মস্তিষ্কের অগ্রভাগ
  • টেম্পোরাল লোব অর্থাৎ মস্তিষ্কের পশ্চাদভাগ
  • সেরিব্রাম বা গুরুমস্তিষ্কের কোনো অংশ

খিঁচুনি

আমাদের স্নায়ুর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বৈদ্যুতিক প্রৈতি (ইম্পালস) মস্তিষ্ক থেকে দেহের অন্যান্য অংশে নির্দেশ প্রেরণ করার কাজে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। যদি মস্তিষ্কে টিউমারনজন্ম নেয়, তবে তা নিজের বৃদ্ধির সাথে সাথে স্থান সঙ্কুলানের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট স্নায়ু ও রক্তজালিকা গুলিকে চাপ দিতে থাকে। এর ফলস্বরূপ স্নায়ুর বৈদ্যুতিক প্রবাহ ব্যাহত হয়, যার জন্য খিঁচুনির মত উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

এই খিঁচুনিও ব্রেন টিউমারের একটি অত্যন্ত সাধারণ উপসর্গ, যা ৫০ শতাংশেরও বেশি ব্রেন টিউমার রোগীর ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়। মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক মাংসপিন্ড গঠন হওয়ায় ব্রেন টিউমারের একটি উল্লেখযোগ্য লক্ষণ।

স্মৃতিভ্রংশ

মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ বা ফ্রন্টাল লোব নামক অংশ চিন্তাপ্রক্রিয়া ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে। সুতরাং, মস্তিষ্কের এই অংশে টিউমার জন্মালে তা থেকে নিম্নলিখিত উপসর্গগুলি দেখা দিতো পারে:

  • সহজেই বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। এই অবস্থাত সূচনা রোজকার সাধারণ কাজকর্মের মধ্য দিয়েই বোঝা যায়। যেমন ধরুন, দিকনির্নয় করতে অক্ষমতা, বা সময়ের সাথে সাথে লোকের নাম ভুলে যাওয়া ইত্যাদি।
  • মনঃসংযোগ করতে অসুবিধা হওয়া
  • একইসাথে একাধিক কাজ করবার ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া বা ব্যাহত হওয়া
  • ব্রেন টিউমারের ফলে আপনার তীব্র স্মৃতিবিভ্রম বা স্মৃতি লোপ পাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাৎক্ষণিক স্মৃতিভ্রংশ (শর্ট টার্ম মেমরি লস) এই রোগের একটি প্রধান লক্ষণ

মুড ডিজঅর্ডার বা অকারণে মেজাজ বিগড়ে যাওয়া

হঠাৎ করে মেজাজ পরিবর্তন হওয়া বা মুড সুইং নামক অসুবিধার সাথে আমরা সকলেই কম বেশি পরিচিত। কিন্তু মুড সুইং আর মুড ডিজঅর্ডার দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। মুড সুইংএর ক্ষেত্রে আপনি হঠাৎ মেজাজের পরিবর্তন লক্ষ্য করবেন। অন্যদিকে, মুড ডিজঅর্ডারের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী এবং তা সময়ের সাথে সাথে ক্রমশ গুরুতর হতে থাকে। এই পরিবর্তন আপনাকে এমনকি নিজের ক্ষতি করার দিকেও চালিত করতে পারে। ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি ইত্যাদি হলো কিছু সাধারণ মুড ডিজঅর্ডারের উদাহরণ। এর পরিচিত রূপ গুলি হলো:

  • সামাজিক পরিস্থিতি বা একাধিক ব্যক্তির উপস্থিতিতে অ্যাংজাইটি দেখা দেওয়া
  • অনিদ্রা
  • নিজের প্রিয় বিষয়গুলির প্রতি অনীহা দেখা দেওয়া
  • নিজেকে নগণ্য বা মূল্যহীন মনে হওয়া
উপরিউক্ত উপসর্গগুলি ছাড়াও মুড ডিজঅর্ডার সংক্রান্ত অন্যান্য লক্ষনগুলি হলো ক্লান্তি ভাব, দুর্বলতা,বমি ভাব বা গা গোলানো ইত্যাদি।

ব্রেন টিউমারের বৈজ্ঞানিক উপসর্গ

দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাওয়া

পিটুইটারি গ্ল্যান্ড বা টেম্পোরাল লোবে টিউমার হলে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, এমনকি লোপ পর্যন্ত পেতে পারে।

কথা বলা, পড়া ও হাতের লেখার ধরণে পরিবর্তন

সেরিব্রাম বা গুরুমস্তিষ্ক, সেরিবেলাম বা লঘু মস্তিষ্ক, টেম্পোরাল লোব বা প্যারাইটাল গ্ল্যান্ডে টিউমার হলে ব্যক্তির কথা বলা, পড়া বা হাতের লেখার নির্দিষ্ট ধরণ পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

ওপরে তাকাতে অসুবিধা

পিনিয়াল গ্ল্যান্ডে টিউমার দেখা দিলে ওপরের দিকে মুখ তুলে তাকানোর ক্ষেত্রে অসুবিধা দেখা দিতে পারে।

ভারসাম্য নষ্ট হওয়া

সেরিবেলাম বা লঘু মস্তিষ্কে টিউমার হলে দেহের ভারসাম্য বিনষ্ট হতে পারে।

নারীদের ক্ষেত্রে স্তন্য উৎপাদনে সমস্যা

পিটুইটারি গ্ল্যান্ডে টিউমার হলে গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে স্তন্যদুগ্ধ উৎপাদনে সমস্যা হয়।

মুখের অসাড়তা

মস্তিষ্কের কাণ্ডে বা স্টেম অংশে টিউমার হলে সমস্ত মুখ বা মুখের একাংশে অসাড়তা, এমনকি মুখে সম্পূর্ন বা আংশিক পক্ষাঘাত পর্যন্ত দেখা দিতে পারে।

যদি আপনি দীর্ঘকাল ধরে উপরিউক্ত উপসর্গগুলির মধ্যে কোনো একটি অথবা একাধিক উপসর্গ লক্ষ্য করে থাকেন, এবং দীর্ঘ সময় পরও অবস্থার কোনোরূপ উন্নতি পরিলক্ষিত না হয়, তাহলে অবিলম্বে আপনার কোনো অভিজ্ঞ স্নায়ু বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করা উচিৎ। চিকিৎসকের সুপারিশ অনুযায়ী পর্যবেক্ষন ও পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে উপস্থিত উপসর্গগুলির সঠিক কারণ অনুসন্ধান করা সম্ভব। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়ে ব্রেন টিউমার ধরা পড়লে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে তার সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব।

ব্রেন টিউমারের প্রকারভেদ

মস্তিষ্কের কোষগুলি অস্বাভাবিক হারে বিভাজিত হতে থাকলে ব্রেন টিউমারের সৃষ্টি হয়। অনেক সময়, এই অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকা কোষ থেকে সৃষ্ট টিউমার মস্তিষ্কের আশেপাশের অন্যান্য কোষেও ছড়িয়ে পড়ে, এবং এইভাবে টিউমারটি ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ব্রেন টিউমার প্রধানতঃ দুই প্রকার হয়, যেমন:

  • বিনাইন, অর্থাৎ ক্যান্সার বিহীন
  • ম্যালিগন্যান্ট, অর্থাৎ ক্যান্সার আক্রান্ত

 

সাধারনতঃ, টিউমার আশেপাশের অঙ্গে ছড়িয়ে পড়াকে ম্যালিগন্যান্সি বা ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ বলে মনে করা হয়।

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের গবেষণা অনুসারে, এখনো পর্যন্ত ১৩০ প্রকারেরও বেশী ব্রেন টিউমার দেখা যায়। এই বিভিন্ন ধরণের টিউমার তাদের উৎপত্তি স্থলের কোষগুলির প্রকার ও প্রকৃতি অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন নাম ও শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়। এই বিভিন্ন প্রকার ব্রেন টিউমার তাদের আকার, মাপ এবং উৎপত্তি স্থল অনুযায়ী একে অপরের থেকে আলাদা হয়। ব্রেন টিউমারের সর্বাধিক পরিচিত প্রকার গুলি নীচে বর্ননা করা হলো:

গ্লিওমাজ

গ্লিওমা নামক ব্রেন টিউমার মস্তিষ্কের গ্লিয়াল কোষে সৃষ্টি হয়। এই গ্লিয়াল কোষ মানবদেহে স্নায়ুর কার্যক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ৩০ শতাংশের বেশী ব্রেন টিউমার সাধারণত গ্লিওমা জাতীয় ব্রেন টিউমারের আওতায় পড়ে। এবং ৮০ শতাংশের বেশী সময় এই গ্লিওমার ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যান্সার আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে।

মূলতঃ চার ধরণের গ্লিয়াল কোষ টিউমার সৃষ্টির জন্য দায়ী। এই চার প্রকারের গ্লিয়াল কোষের শ্রেণীবিভাগ তাদের প্রকৃতি ও জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুসারে করা হয়। এই কোষগুলির জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে টিউমারের প্রকৃতি ও ক্যান্সারের সম্ভাবনা সম্পর্কে অনুমান করা সম্ভব হয়। এই চার ধরণের গ্লিয়াল সেল বা কোষের বিবরণ নীচে ব্যাখ্যা করা হলো:

১. অ্যাস্ট্রোসাইটোমা

এই ধরণের টিউমার অ্যাস্ট্রোসাইট নামক কোষে উৎপন্ন হয় এবং প্রধানত মস্তিস্ক এবং সুষুম্নাকান্ড (মেরুদন্ড)–এই দুই অংশে দেখা যায়। এই কোষগুলি ধীরে ধীরে ম্যালিগন্যান্ট কোষে পরিণত হয়, অথবা খুব দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেয়ে ক্যান্সার আক্রান্ত হতে পারে। অ্যাস্ট্রোসাইটোমা টিউমারের সাধারণ উপসর্গগুলি হলো খিঁচুনি, মাথা ব্যথা, বমি ভাব ইত্যাদি।

২. এপেনডাইমোমা

এই ধরণের টিউমার সাধারণত মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকাণ্ডে অবস্থিত এপেনডাইমাল কোষ থেকে উৎপন্ন হয়। যেহেতু এই কোষগুলি স্নায়ুতন্ত্রের পুষ্টিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, সেই কারণে এই ধরণের টিউমার হলে স্নায়ুর ভারসাম্য কিছুটা বিঘ্নিত হতে পারে।

৩. অলিগোডেন্ড্রোগ্লিওমা

এই জাতীয় টিউমার অলিগোডেন্ড্রোসাইট নামক কোষে উৎপন্ন হয়। উক্ত কোষগুলি স্নায়ু ও স্নায়ুতন্ত্রের রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই ধরণের টিউমার যে কোনো বয়সে দেখা দিতে পারে। সাধারণত এই টিউমারে আক্রান্ত হলে রোগীর ক্ষেত্রে অত্যধিক শারীরিক ক্লান্তি ও বিকলাঙ্গতা ইত্যাদি উপসর্গ লক্ষ্য করা যায়।

৪. জাইলোব্লাস্টোমা

জাইলোব্লাস্টোমা জাতীয় টিউমার অ্যাস্ট্রোসাইট নামক কোষ থেকেই উৎপন্ন হয়। কিন্তু অ্যাস্ট্রোসাইটোমা টিউমারের তুলনায় অনেক বেশি গুরুতর হয়। এই টিউমারে ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যান্সার আক্রান্ত হবার সম্ভাবনাও অনেক বেশি হয়। ছোটদের তুলনায় পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যেই এই টিউমারের সম্ভাবনা অধিক দেখা যায়।

ক্রেনিওফ্যারিঞ্জিওমা

ক্রেনিওফ্যারিঞ্জিওমা হলো এক ধরনের ব্রেন টিউমার যা খুলির গোড়ার অংশে বা সুষুম্নাকান্ডের নিম্নভাগে অত্যন্ত ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের মধ্যে এই ধরণের টিউমারে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা সর্বাধিক হয়। তবে এই ধরণের টিউমার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিনাইন বা ক্যান্সার মুক্ত হয়ে থাকে। মোট ব্রেন টিউমারের মাত্র ২ শতাংশ ক্রেনিওফ্যারিঞ্জিওমা শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে।

মেডুলোব্লাস্টোমা

মেডুলোব্লাস্টোমা এক ধরণের ম্যালিগন্যান্ট ব্রেন টিউমার। এই প্রকার ব্রেন টিউমার প্রধানতঃ পূর্ণবয়স্কদের তুলনায় ৪ থেকে ১০ বছরের শিশুদের মধ্যে বেশি লক্ষ্য করা যায়। এই প্রকার টিউমার সাধারণত মস্তিষ্কের সেরিবেলাম অংশে দেখা যায়। এবং এর নামকরণ মেডুলা নামক অংশের নাম অনুযায়ী করা হয়। এই মেডুলা মস্তিষ্ক এবং সুষুম্নাকান্ডের উপরিভাগের সংযোগকারী একটি অংশ। মেডুলোব্লাস্টোমা নামক টিউমার নিজের উৎপত্তি স্থল থেকে ক্রমশঃ সুষুম্নাকান্ড ধরে দেহের নীচের দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

মেনিনজিওমা

মেনিনজিওমা এক ধরনের সাধারণ ব্রেন টিউমার যা করোটির অন্তঃস্থলে উৎপন্ন হয়। এই জাতীয় টিউমার সাধারনত বিনাইন হয় এবং সমস্ত প্রকার টিউমারের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ টিউমার মেনিনজিওমা শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে মেনিঞ্জেস নামক অংশ, যা প্রকৃতপক্ষে একটি পর্দার মত, সেই স্থল থেকে এই মেনিনজিওমা টিউমারের উৎপত্তি হয়। ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যান্সার আক্রান্ত মেনিনজিওমা খুবই বিরল প্রজাতির টিউমার।

পিটুইটারি অ্যাডিনোমা টিউমার

গ্লিওমা টিউমারের পরেই পিটুইটারি অ্যাডিনোমা টিউমারই হলো সর্বপেক্ষা সাধারণ প্রজাতির ব্রেন টিউমার। এই টিউমারটিও করোটির অন্তঃস্থলে উৎপন্ন হয় এবং ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বাধিক পরিলক্ষিত হয়। কিছু কিছু বিরল ঘটনায় এই ধরণের টিউমার শিশুদের মধ্যেও দেখা যায়। কিন্তু আশার কথা হল এই যে এই জাতীয় টিউমার সহজেই অপারেশনের মাধ্যমে নিরাময় করা যায়। বেশিরভাগ পিটুইটারি অ্যাডিনোমা টিউমারই বিনাইন প্রকৃতির হয়। যদি এই টিউমার ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যান্সার আক্রান্ত হয়েও পড়ে , তা সাধারণত দেহের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে না। অর্থাৎ, এই জাতীয় টিউমারের ক্ষেত্রে মেটাস্টেসিসের ঘটনা খুবই বিরল।

হিমাঞ্জিওব্লাস্টোমা

হিমাঞ্জিওব্লাস্টোমা নামক টিউমার অত্যন্ত ধীরে বৃদ্ধি পায়। নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যেই এই ধরণের টিউমারের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। সাধারনত মস্তিষ্কের সেরিবেলাম অংশের রক্তজালিকা থেকে এই প্রকার টিউমারের উৎপত্তি হয়। ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের মধ্যে এই টিউমারের প্রকোপ বেশি লক্ষ্য করা যায়। হিমাঞ্জিওব্লাস্টোমা সাধারণত বড় আকারের হয়, এবং এই রোগে টিউমার হতেও পারে, বা নাও পারে।
উপরিউক্ত টিউমারের প্রকারভেদ ছাড়াও নানা রকম ব্রেন টিউমার দেখা যায়। বিস্তারিত জানার জন্য আপনার সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পরামর্শ দেবেন, যার মাধ্যমে টিউমারের সঠিক অবস্থান, আকার, কারণ, জটিলতা, টিউমারটি ম্যালিগন্যান্ট কি না এবং তার নিরাময় হবার সম্ভাবনা কতখানি, এসবই সবিস্তারে জানা সম্ভব।

ব্রেন টিউমারের চিকিৎসা

ব্রেন টিউমারের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রণালী সাধারণত টিউমারটির আকার, অবস্থান, প্রকার ও বর্তমান অবস্থার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়।

এছাড়াও রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং পছন্দের চিকিৎসা পদ্ধতির ওপরও সমপরিমাণ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিনাইন বা বিহীন টিউমারের ক্ষেত্রে প্রধানত সার্জারি বা অপারেশনের মাধ্যমে টিউমার বাদ দেবার প্রণালীই ব্রেন টিউমারের চিকিৎসায় ডাক্তারদের প্রাথমিক পরামর্শ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যান্সার আক্রান্ত টিউমারের ক্ষেত্রে সার্জারি ছাড়াও কেমো, রেডিয়েশন থেরাপি এবং অন্যান্য প্রণালীর (ইন্টারভেনশন) মাধ্যমেও এই চিকিৎসা হয়ে থাকে।

ব্রেন টিউমার অনেক সময় ব্রেন ক্যান্সার নামেও পরিচিত হয়। নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলি হল ব্রেন টিউমার চিকিৎসার সর্বাধিক প্ৰচলিত পদ্ধতি:

সার্জারি

ব্রেন টিউমারের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকেরা সর্বপ্রথম টিউমারটি অপারেশন করে বাদ দেবার পরামর্শই দিয়ে থাকেন।

ছোট আকারের টিউমার, যেগুলি কম জটিল অংশে অবস্থান করে, সেগুলি অপারেশন করা তুলনামূলক ভাবে সহজ। কিন্তু যদি টিউমারটি আকারে বড় হয়, বা মস্তিষ্কের কোনো জটিল স্থানে থেকে থাকে, তবে তা অপারেশন করা অপেক্ষাকৃত কঠিন। এই ধরণের জটিল অপারেশনে অনেক ক্ষেত্রেই অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, যেমন দৃষ্টি বা শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ইত্যাদি। যাই হোক, স্নায়ু বিশেষজ্ঞ বা নিউরোসার্জেনরা চেষ্টা করেন যতটা সম্ভব টিউমার বাদ দেবার।

বর্তমানে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থাযুক্ত হাসপাতালগুলি জটিল ব্রেন টিউমার অপারেশনের জন্য আধুনিক রোবোটিক সার্জারির সাহায্য নেন। এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের গভীরে অবস্থিত টিউমারও কোনো আনুষঙ্গিক ক্ষতি ছাড়াই অপারেশন করা যায়।

ব্রেন টিউমারের অন্যান্য চিকিৎসা

সার্জারি বা অপারেশন ছাড়াও মেটাস্ট্যাটিক বা ক্যান্সার আক্রান্ত ব্রেন টিউমার চিকিৎসার নানারকম পদ্ধতি রয়েছে। যেমন:

কেমোথেরাপি

কেমোথেরাপি হল মূলতঃ একটি ক্যান্সার প্রতিরোধক ওষুধ বা চিকিৎসা ব্যবস্থা, যা শরীরের অভ্যন্তরে অতি দ্রুতহারে বাড়তে থাকা ক্যান্সার সেল বা কোষগুলির বৃদ্ধি রোধ করতে সহায়তা করে এবং তাদের নির্মূল করে। এই ওষুধ সাধারণতঃ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলা ক্যান্সার সেল বা কোষগুলিকে ধ্বংস করার মাধ্যমে ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।

যদিও কেমোথেরাপির বেশ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে, তা সত্ত্বেও এটি ক্যান্সারের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সর্বাধিক প্রচলিত পদ্ধতি। এই চিকিৎসা পদ্ধতি রেডিয়েশন বা ক্যান্সারের অপারেশনের চাইতে আলাদা। কারণ, রেডিয়েশন থেরাপি বা অপারেশন ক্যান্সারে আক্রান্ত কোষগুলিকে তাদের নির্দিষ্ট স্থানে লক্ষ্য করে চিকিৎসা করে। অন্যদিকে, কেমোথেরাপির ওষুধ মেটাস্টেসিস পর্যায়ে থাকা অর্থাৎ দেহের অন্যান্য অংশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া ক্যান্সার সেলগুলিকেও ধংস করতে সক্ষম। (আরও বিস্তারিত জানতে পড়ুন: কেমোথেরাপি)

রেডিয়েশন থেরাপি

রেডিয়েশন থেরাপি হল এমন এক ধরণের ক্যান্সার চিকিৎসা যাতে ক্যান্সার সেলগুলি ধংস করার জন্য উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন রশ্মি প্রয়োগ করে টিউমারটি বা টিউমারগুলিকে সঙ্কুচিত কর হয়। এই উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন রশ্মি ক্যান্সার সেলের ডি এন এ ধ্বংস করে শরীরের ক্যান্সার নির্মূল করে। ক্ষতিগ্রস্ত ডি এন এ বিশিষ্ট ক্যান্সার সেলগুলি আর বাড়তে পারেনা, ফলে তা ক্রমশঃ ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর , সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত কোষগুলি দেহের স্বাভাবিক নিয়মেই দেহ থেকে অপসারিত হয়ে যায়, এবং এইভাবে ক্যান্সার নির্মূল হয়। (আরও বিস্তারিত জানতে পড়ুন: রেডিয়েশন থেরাপি)

ব্র্যাকিথেরাপি

ব্র্যাকিথেরাপি হলো এক ধরণের রেডিয়েশন থেরাপি যাতে চালের দানার আকারের রেডিয়েশন সিড বা কণা টিউমার যেখানে অবস্থান করে, সেই অংশে একটি সরু সূঁচের মাধ্যমে স্থাপন করা হয়। এই প্রণালী আল্ট্রাসাউন্ড ইমেজিং পদ্ধতির সাহায্যে করা হয়। এই রেডিয়েশন কণাগুলি থেকে দীর্ঘ সময় ধরে আক্রান্ত অংশে মৃদু ক্ষমতা সম্পন্ন বিকিরণ হতে থাকে। নির্দিষ্ট সময় পর এই কণাগুলি থেকে বিকিরণ হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বিকিরণ বন্ধ হয়ে গেলেও এই কণাগুলি শরীর থেকে অপসারণ করার প্রয়োজন হয়না।

স্টিরিওট্যাকটিক রেডিও সার্জারি

স্টিরিওট্যাকটিক রেডিও সার্জারি (SRS) হল একধরণের অত্যাধুনিক রেডিও সার্জারি। এই পদ্ধতিতে মাল্টি ডাইমেনশনাল ইমেজিং ব্যবহার করে ক্যান্সার আক্রান্ত টিউমারটির ওপর উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন রেডিয়েশন বীম ফেলা হয়। এই চিকিৎসা পদ্ধতি আশেপাশের কোনো অংশের ক্ষতি না করে বা অন্যান্য সুস্থ স্বাভাবিক কোষের ওপর প্রভাব বিস্তার না করে শুধুমাত্র ক্যানসার আক্রান্ত টিউমারটির ওপর প্রতিক্রিয়া করতে সক্ষম। সর্বাধিক প্ৰচলিত SRS এর প্রণালীগুলি হলো:

  • লিনিয়ার অ্যাকসিলারেটর মেশিন। এর মধ্যে সাইবার নাইফ নামক যন্ত্র সর্বাধিক জনপ্রিয়।
  • গামা নাইফ (বর্তমানে বিশেষ ব্যবহার হয় না)
  • প্রোটন বীম থেরাপি। এটি একটি অত্যাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি এবং কেবলমাত্র বিশেষ বিশেষ হাসপাতালে এটি উপলব্ধ।

ইমিউনোথেরাপি

ইমিউনথেরাপি, বা বায়োলজিক্যাল থেরাপি হল এক উন্নত ধরণের ক্যান্সারের চিকিৎসা। এই পদ্ধতিতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটিয়ে শরীরকে ক্যান্সারের সাথে লড়ার উপযোগী করে তোলা হয়, যাতে তা নিজেই ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে। ইমিউনথেরাপিতে দেহে তৈরী হওয়া নিজস্ব উপাদান অথবা গবেষণাগারে তৈরী উপাদান ব্যবহার করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। (আরও বিস্তারিত জানতে পড়ুন: ইমিউনোথেরাপি)

যোগাযোগ করুন

*দ্রষ্টব্য: বর্তমানে, আমরা শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক চিকিৎসা ভ্রমণকারীদের ভারতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সহায়তা করছি।

টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন