হজকিন্স লিম্ফোমা

এই পোস্টে পড়ুন: English العربية Русский 'তে

হজকিন্স লিম্ফোমা

হজকিন্স লিম্ফোমা হল লসিকাগ্রন্থি বা লিম্ফনোডের ক্যান্সার। এই লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম বা লসিকাগ্রন্থি মানবদেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থার (ইমিউনিটি সিস্টেম) একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ক্যান্সার যেকোনো বয়সেই হতে পারে। কিন্তু ২০ থেকে ৪০ বছর বয়স সময়কালেই এর প্রাদুর্ভাব সবথেকে বেশি দেখা যায়। ৫৫ বছর বা তদুর্ধ বয়সীদের ক্ষেত্রেও এই রোগ হবার সম্ভাবনা সমানভাবে প্রবল। হজকিন্স লিম্ফোমা হলে শরীরের সমস্ত কোষগুলিতে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা যায়, যা ক্রমশঃ সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমে মূলতঃ দুইধরণের ক্যান্সার হতে পারে। তাদের মধ্যে একটি হলো হজকিন্স লিম্ফোমা, আর অন্যটি নন-হজকিন্স লিম্ফোমা নামে পরিচিত।

শরীরের শ্বেত রক্তকণিকা আমাদের শরীরকে নানারকম রোগজীবাণু ও সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে। হজকিন্স লিম্ফোমা এই শ্বেত রক্তকণিকা থেকেই সৃষ্টি হয়। রোগবৃদ্ধির সাথে সাথে শরীর ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ফলস্বরূপ, সংক্রমণের সাথে লড়ার ক্ষমতা হারায়। এই রোগে শরীরের কোষগুলি খুব দ্রুত সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ম্যালিগন্যান্ট কোষে পরিণত হয়। এই ম্যালিগন্যানয় কোষগুলি শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও প্রভাব বিস্তার করে। সাধারণতঃ নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যেই এই রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশি দেখা যায়।

হজকিন্স লিম্ফোমার প্রকারভেদ

রোগাক্রান্ত দেহকোষগুলির প্রকার এবং তাদের ক্রিয়াকলাপের ওপর হজকিন্স লিম্ফোমার প্রকৃতি নির্ভর করে। এই রোগ মূলতঃ দুইপ্রকার

  • ক্লাসিক হজকিন্স ডিজিজ
  • নডিউলার লিম্ফোসাইটিক প্রিডমিন্যান্ট হজকিন্স লিম্ফোমা

 

ক্লাসিক হজকিন্স লিম্ফোমা:

এই রোগের সর্বাধিক পরিচিত রূপ হল ক্লাসিক হজকিন্স লিম্ফোমা। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দেহকোষ গুলি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়। এই বর্ধিত কোষগুলিকে রিড-স্টারনবার্গ কোষ বলা হয়। ক্লাসিক হজকিন্স লিম্ফোমার আবার চারটি প্রকারভেদ আছে:

  • নডিউলার স্ক্লেরোসিস হজকিন্স লিম্ফোমা—এই রোগের ক্ষেত্রে একটিমাত্র লিম্ফ নডিউলের চারপাশে কোলাজেনের আস্তরণ তৈরি হয়। এছাড়াও এতে সুস্পষ্ট ফাঁক-যুক্ত রিড-স্টারনবার্গ কোষ সংস্থান সৃষ্টি হয়, যা এইজাতীয় কোষের চরিত্রগত বৈশিষ্ট।
  • মিক্সড সেলুলারিটি হজকিন্স লিম্ফোমা—এটিও একধরণের ক্লাসিক হজকিন্স লিম্ফোমা এবং প্রকৃতপক্ষে নডিউলার স্ক্লেরোসিস হজকিন্স লিম্ফোমার পরেই এই প্রকারের লিম্ফোমা সর্বাপেক্ষা বেশী দেখা যায়। হজকিন্স আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে একটি বড় অংশ এইপ্রকার ক্যানসারের শিকার।
  • লিম্ফসাইট-ডিপ্লিটেড হজকিন্স লিম্ফোমা—এই ধরণের লিম্ফোমার ক্ষেত্রেও শরীরে অধিকমাত্রায় রিড-স্টারনবার্গ কোষ দেখা যায়। যদিও এক্ষেত্রে নন-নিওপ্লাস্টিক লিম্ফোসাইটের মাত্রা অনেক কম থাকে। লিম্ফোসাইটও একধরণের রক্তকণিকা যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ও শরীরকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
  • লিম্ফোসাইট-রিচ হজকিন্স লিম্ফোমা—এই প্রকার লিম্ফোমাও ক্লাসিক হজকিন্স লিম্ফমারী একটি প্রকারভেদ। এই রোগের ক্ষেত্রে রিড-স্টারনবার্গ কোষগুলি ডিফিউস সেলুলার ব্যাকগ্রাউন্ড বা অন্যান্য কোষের প্রাচীরে বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে থাকে। এছাড়াও রক্তে অল্পমাত্রায় লিম্ফোসাইট দেখা যায় এবং ইওসিনোফিল ও নিউট্রোফিল রক্তকণিকা অনুপস্থিত থাকে।

 

নডিউলার লিম্ফোসাইটিক প্রিডমিন্যান্ট হজকিন্স লিম্ফোমা:

এই প্রকার লিম্ফোমা একটি অত্যন্ত বিরল প্রজাতির হজকিন্স লিম্ফোমা। এই রোগে শরীরে অসংখ্য বিশালাকার, অস্বাভাবিক কোষের সৃষ্টি হয়, যা পপকর্ন সেল নামে পরিচিত। কারণ এই কোষগুলি পপকর্ণের মতই দেখতে হয়। যদি প্রাথমিক পর্যায়েই এই রোগ নিরূপণ ও চিকিৎসা শুরু করা যায়, তবে রোগীর পুরোপুরিভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।

হজকিন্স লিম্ফোমার কারণ

যদিও হজকিন্স লিম্ফোমা সঠিক কারণ এখনো অজ্ঞাত, তবে মূলতঃ এই রোগ শরীরের রোগ প্রতিরোধকারী কোষগুলির অস্বাভাবিক বিবর্তনের ফলে সৃষ্ট রোগগ্রস্ত কোষ ও তাদের দ্রুতহারে সংখ্যাবৃদ্ধির ফলেই হয় বলেই মনে করা হয়। এই বিবর্তনের ফলে লসিকাগ্রন্থিতে প্রচুর পরিমাণ অস্বাভাবিক লিম্ফোসাইট জমা হয়, যা শরীরের সুস্থ সবল কোষগুলিকে কাজ করা থেকে আটকে দিয়ে হজকিন্স লিম্ফোমা সৃষ্টি করে।

হজকিন্স লিম্ফোমার লক্ষণ

এই রোগের উপসর্গ বা লক্ষনগুলি হল:

  • রাতে ঘাম হওয়া
  • অ্যালকোহলের প্রভাবে তীব্র প্ৰতিক্রিয়া
  • বগল ও কুঁচকির চারপাশের লসিকাগ্রন্থি গুলি ব্যথাহীন ভাবে ফুলে ওঠা
  • অকারণে ওজন কমে যাওয়া
  • ক্লান্তি
  • মদ্যপানের পর লসিকাগ্রন্থিগুলিতে ব্যথা
  • প্রচন্ড চুলকানি হওয়া
  • জ্বর

রোগনির্ধারণ বা ডায়াগনোসিস

হজকিন্স লিম্ফোমা নির্ধারণ করার জন্য রোগীর পূর্ব ইতিহাসের বিস্তারিত বিবরণ প্রয়োজন। এর জন্য চিকিৎসক আপনাকে আপনার জীবনযাপন ও আগেকার অসুখ-বিসুখের বিষয়ে, এমনকি আপনার পরিবারের অন্যান্যদের বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন। এরপর তিনি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দেবেন।

শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা : সাধারণ কিছু শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে আপনার চিকিৎসক হজকিন্স লিম্ফোমার উপস্থিতি বুঝতে পারেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল প্লীহা, যকৃৎ, ঘাড়, বগল এবং কুঁচকিতে থাকা লসিকাগ্রন্থিনগুলিতে ফোলাভাব আছে কিনা পরীক্ষা করা।

রক্তপরীক্ষা : রক্তপরীক্ষা হজকিন্স লিম্ফোমাসহ আরো নানারকম রোগ নির্ধারণ করার পক্ষে একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপায়। এর জন্য চিকিৎসক আপনাকে রক্তের নমুনা দেবার পরামর্শ দেবেন। এরপর প্যাথলজিস্ট সেই নমুনা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখবেন হজকিন্স লিম্ফোমার জন্য দায়ী কোষগুলি রক্তে উপস্থিত আছে কিনা।

ইমেজিং : প্যাথলজি ছাড়াও চিকিৎসক শরীরে নানা অংশে হজকিন্স লিম্ফোমার উপসর্গ নির্ণয়ের জন্য ইমেজিংয়ের সাহায্য নিতে পারেন। এর জন্য নানাধরণের পদ্ধতি রয়েছে, যাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল এক্স-রে, পজিট্রন এমিশন টোমোগ্রাফি এবং কম্পিউটেড টোমোগ্রাফি।

লিম্ফ নোডের বায়োপ্সি : লিম্ফ নোডের বায়োপ্সি হজকিন্স লিম্ফোমা নির্ণয়ের একটি অত্যন্ত প্রচলিত নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। এই পরীক্ষার জন্য শরীরের কোনো একটি লসিকাগ্রন্থি বা লিম্ফ নোড অপসারণ করে ল্যাবরেটরিতে তার পরীক্ষা করা হয়। প্যাথলজিস্ট যদি এই নমুনা পরীক্ষা করে দেখেন যে তাতে অস্বাভাবিক রিড-স্টারনবার্গ কোষ উপস্থিত রয়েছে, তবে তিনি অবিলম্বে হজকিন্স লিম্ফোমার লক্ষণ অনুসন্ধান করবেন।

অস্থিমজ্জার নমুনা পরীক্ষা : হজকিন্স লিম্ফোমা নির্ণয়ের আরো একটি প্রচলিত উপায় হল অস্থিমজ্জা বা বোন ম্যারো অ্যাসপিরেশন ও বায়োপ্সি। এর জন্য চিকিৎসক একটি সিরিঞ্জ বা সূঁচের মাধ্যমে কশেরুকা বা হিপ বোন থেকে প্ৰয়োজনীয় অস্থিমজ্জার নমুনা সংগ্রহ করেন। এরপর প্যাথলজিস্ট সেই নমুনা পরীক্ষা করে দেখেন যে তাতে কোনো অস্বাভাবিক কোষ উপস্থিত আছে কিনা।

হজকিন্স লিম্ফোমার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা

এই রোগের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা রোগের প্রকার, বর্তমান অবস্থা, এবং তার ভয়াবহতা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। এছাড়াও রোগীর শারীরিক অবস্থা, বয়স ও নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দেরও এই রোগ নির্ণয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই রোগের চিকিৎসায় প্রাথমিক লক্ষ্য হল রোগেকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ক্যান্সারকোষ গুলিকে যথাসম্ভব ধ্বংস করে ক্যান্সারের ছড়িয়ে পড়া থেকে প্রতিহত করা।

কেমোথেরাপি

কেমোথেরাপির মাধ্যমে শরীরের ক্ষতিকর কোষগুলোকে প্রয়োজনীয় রাসায়নিকযুক্ত ওষুধের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়। এর জন্য ব্যবহৃত ওষুধ রক্তের মাধ্যমে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলস্বরূপ তা সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে যায় ও অস্বাভাবিক কোষগুলিকে ধ্বংস করে। আরো কার্যকরী ফলের জন্য সাধারণতঃ চিকিৎসকেরা কেমোথেরাপির সাথে সাথে রেডিয়েশন থেরাপিরও পরামর্শ দেন। কেমোথেরাপির ওষুধগুলি খাওয়ার বড়ি ও শিরার মাধ্যমে এই দুভাবেই দেওয়া হয়। যদিও কেমোথেরাপির ক্ষেত্রে বেশ কিছু পার্র্শ্বপ্রতিক্রিয়া যেমন বমিভাব, চুল পড়ে যাওয়া ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।

রেডিয়েশন থেরাপি

রেডিয়েশন থেরাপির মাধ্যমে উচ্চ-ক্ষমতা সম্পন্ন রশ্মি যেমন প্রোটন রশ্মি বা এক্স-রে শরীরে প্রবেশ করিয়ে চিকিৎসা করা হয়। এই উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন রশ্মিগুলি হজকিন্স লিম্ফোমার ক্ষতিকর ক্যান্সার কোষগুলিকে ধ্বংস করতে সম্ভব। সাধারণতঃ এই রেডিয়েশন থেরাপি কয়েক সপ্তাহ ধরে চলে। প্রতি সপ্তাহে পাঁচ দিন করে রোগীকে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন

অস্থিমজ্জা বা বোন ম্যারো প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে শরীরের অস্বাভাবিক, রোগগ্রস্ত কোষগুলিকে নতুন, সুস্থ কোষ দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হয়। যদি কেউ একাধিকবার এই রোগে আক্রান্ত হন, তবে সেক্ষেত্রে এই প্রতিস্থাপন বিশেষভাবে কার্যকরী একটি পদ্ধতি।

ভারতের সেরা হাসপাতালের তালিকা

আপনি কি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে আগ্রহী? ভারতের সেরা সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে মতামত এবং চিকিত্সার জন্য অনুমান পান।
Check out!

ভারতে চিকিৎসা!

আপনি যদি একজন বিদেশী নাগরিক হয়ে থাকেন যিনি ভারতে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুঁজছেন, আমরা আপনাকে সাহায্য করতে পেরে খুশি হব !

Contact Us

Speak to a Patient Counselor | Get Free Medical Opinion & Estimate | Book Priority Appointment