জন্মগত বিকলাঙ্গতার প্রতিকার ও চিকিৎসা

এই পোস্টে পড়ুন: English العربية 'তে

জন্মগত বিকলাঙ্গতার প্রতিকার ও চিকিৎসা

জন্মগত বিকলাঙ্গতা বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ত্রুটিযুক্ত গঠন এমন একটি রোগ যার সূচনা গর্ভাবস্থাতেই হয়ে যায়। বিকলাঙ্গতার প্রবণতা থাকলে শিশুর জন্মের পূর্বে মাতৃগর্ভে ভ্রুণের বিকাশ হবার সময় শরীরের নীচের অথবা উপরিঅংশের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি যথাযথ ভাবে গঠিত হয়না। এর ফলে ভ্রুণের অস্বাভাবিক বা অপূর্ণ বিকাশ ঘটে, এবং শিশু বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মগ্রহণ করে।

বিকলাঙ্গতার চিকিৎসা বা সংশোধনমূলক চিকিৎসা একেক ব্যক্তির জন্য একেক রকম হয়ে থাকে। এই পার্থক্যের মূল কারণ হল ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতির মূল লক্ষ্য, যা প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা হয়। যদিও এই চিকিৎসা পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হল শিশুর শরীরের ত্রুটিগুলি সংশোধন করে তার বৃদ্ধিতে সহায়তা করা এবং তাকে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে সক্ষম করে তোলা।

বিকলাঙ্গতা সংশোধন করার জন্য নানারকম চিকিৎসা ব্যবস্থা উপলব্ধ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থাগুলি হল অপারেশন বা সার্জারি, নকল অঙ্গ প্রতিস্থাপন এবং পুনর্বাসন বা রিহ্যাবিলিটেশন থেরাপি।

জন্মগত বিকলাঙ্গতার প্রকারভেদ

মূলতঃ দুই ধরণের জন্মগত বিকলাঙ্গতা দেখা যায়। যেমন-

১. লঙ্গিচিউডিনাল ডেফিশিয়েন্সি বা অনুদৈর্ঘ বিকলাঙ্গতা: এই ধরণের জন্মগত বিকলাঙ্গতার ক্ষেত্রে হাত বা পায়ের উল্লেখযোগ্য অংশ যেমন রেডিয়াস, ফিবুলা বা টিবিয়ার হাড় গঠিত হয়না, বা তার অসম্পূর্ণ গঠন হয়।

২. ট্রান্সভার্স ডেফিশিয়েন্সি বা অনুপ্রস্থ বিকলাঙ্গতা: এই জাতীয় বিকলাঙ্গতার ক্ষেত্রে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অংশগুলি আংশিক বা ত্রুটিপূর্ণ ভাবে গঠিত হয়। হাত বা পায়ের প্রয়োজনীয় অংশগুলির বিকাশ হয় ঠিকই, কিন্তু তা হয় একটি নির্দিষ্ট অবস্থা পর্যন্ত। এই আংশিক বা ত্রুটিপূর্ণ গঠনের ফলে হাত বা পায়ের আকার কাটা পড়া হাত বা পায়ের মত দেখায়, যদিও বাস্তবে এই বিকৃতি বিকলাঙ্গতার কারণেই হয়।

এই দুই ধরণের বিকলাঙ্গতা ছাড়াও অন্যান্য যে সমস্ত অঙ্গহানির প্রকারভেদ সাধারণতঃ দেখা যায়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল প্রি-অ্যাক্সিয়াল পলিড্যাকটিলিটি বা অতিরিক্ত অঙ্গের উপস্থিতি। এর সর্বাপেক্ষা পরিচিত উদাহরণ হল অতিরিক্ত হাতের আঙ্গুল তৈরি হওয়া। এই অতিরিক্ত আঙ্গুলগুলি সাধারণতঃ বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ বা বুড়ো আঙুল ও কনিষ্ঠা বা কড়ে আঙুলের পাশে তৈরি হয়। কিন্তু এগুলি সবসময় অন্যান্য আঙুলের মত সঠিকভাবে গঠিত নাও হতে পারে। এছাড়াও কিছু বিরল ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মধ্যমা, অনামিকা ও তর্জনীও তৈরি হতে পারে। এই বিকলাঙ্গতার কারণকে সেন্ট্রাল পলিড্যাকটিলিটি বলা হয়। এর বাইরে সিন্ড‍্যাকটিলিটি নামক বিকলাঙ্গতার কারণে হাত ও পায়ের আঙুল জড়ানো অবস্থায় তৈরি হতে পারে। এই অবস্থাও একধরনের বিকলাঙ্গতা। বিভ্রান্ত হবার কোন কারন নেই। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা মেডিক্যাল টিম আপনাকে আপনার শিশুর বিকলাঙ্গতার সঠিক ধরণ ও অবস্থা বুঝতে সহায়তা করবেন। এবং তার সাথেই আপনার শিশুর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী তার জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কেও সঠিক পরামর্শ দেবেন।

জন্মগত বিকলাঙ্গতার সাধারণ কারণ সমূহ

এখনো পর্যন্ত্য জন্মগত বিকলাঙ্গতার সঠিক ও সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। তা সত্বেও, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা ও গবেষণার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসকরা কিছু বিষয়কে শিশুদের জন্মগত বিকলাঙ্গতার সাধারণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। এই কারণ গুলি হল:

  • গর্ভাবস্থায় ভ্রুণের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ
  • বংশগতির মাধ্যমে পিতামাতা অথবা অন্যান্য পূর্বপুরুষের জিনগত ত্রুটি শিশুর জিনে বাহিত হওয়া
  • গর্ভাশয়ের প্রতিকূল বা অবাঞ্ছিত অবস্থা যা ভ্রুণের বৃদ্ধি ও বিকাশে বাধাদান করে
  • মাতৃজঠরে থাকাকালীন শিশুর ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসা
  • মা যদি গর্ভাবস্থায় ক্ষতিকর বা তীব্র প্রতিক্রিয়া করতে পারে এমন কোনো ওষুধ খান

যেসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজ জন্মগত বিকলাঙ্গতার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে

চিকিৎসক ও গবেষকদের মতে কিছু কিছু কাজ বা পরিস্থিতি শিশুর জন্মগত বিকলাঙ্গতা, এমনকি জন্মের পরবর্তী সময়েও শারীরিক বিকলাঙ্গতার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। এইগুলি হল:

  • ধূমপান বা গর্ভাবস্থায় তামাকজাত দ্রব্যের সংস্পর্শে আসা
  • গর্ভাবস্থায় ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে আসা
  • গর্ভাবস্থায় যান্ত্রিক শক্তি বা কঠোর পরিশ্রমের প্রভাবে

জন্মগত বিকলাঙ্গতা নিরূপণ বা ডায়াগনোসিস

সাধারণতঃ জন্মের সাথে সাথেই শিশুর শরীরে জন্মগত বিকলাঙ্গতার লক্ষণ বোঝা যায়। এরূপ বিকলাঙ্গতার অন্তর্নিহিত কারণ বা অজ্ঞাত উপসর্গগুলি জানার জন্য, এমনকি শিশুর হাড়ের অপ্রকাশিত অবস্থা জানার জন্যও চিকিৎসকেরা এক্স-রে ও অন্যান্য জেনেটিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শও দিতে পারেন।

সম্ভাব্য সংশোধনমূলক চিকিৎসা পদ্ধতি

জন্মগত বিকলাঙ্গতার জন্য সম্ভাব্য সংশোধনমূলক চিকিৎসা পদ্ধতি নিরূপণ শিশুর বয়স, দেহের ওজন এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা ও সুস্থতার ওপর নির্ভর করে। এছাড়াও অন্যান্য যে বিষয়গুলি এই সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল শিশুর বিকলাঙ্গতার ধরণ এবং কোনো নির্দয় ওষুধ বা থেরাপির প্রতি তার প্রতিক্রিয়া বা সহ্যক্ষমতা।
জন্মগত বিকলাঙ্গতা সংশোধনে ব্যবহৃত সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতিগুলি হল-

সার্জারি বা অপারেশন

পলিড্যাকটিলি বা সিন্ড‍্যাকটিলি বিকলাঙ্গতার ক্ষেত্রে সার্জারি বা অপারেশনের মাধম্যে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ত্রুটি সংশোধন করা সম্ভব। এই পদ্ধতিতে অতিরিক্ত অঙ্গগুলি কেটে বাদ দেওয়াও যায়।

প্রস্থেটিক বা নকল অঙ্গ প্রতিস্থাপন

যেসমস্ত ক্ষেত্রে দেহের কোন অঙ্গ, বিশেষতঃ হাত বা পা, সম্পূর্ন বা আংশিকভাবে বিকলাঙ্গ হয়, সেক্ষেত্রে চিকিৎসক নকল অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

রিহ্যাবিলিটেশন বা পুনর্বাসন প্রক্রিয়া

রিহ্যাবিলিটেশন বা পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় মূলতঃ ফিজিক্যাল থেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। এই ব্যবস্থা শিশু বা যেকোনো বয়সের বিকলাঙ্গ ব্যক্তিকে প্রস্থেটিক অর্থাৎ নকল অঙ্গ ব্যবহারে অভ্যস্ত করে তোলার জন্য বিশেষভাবে কার্যকরী।

জন্মগত বিকলাঙ্গতার সংশোধন ও চিকিৎসা পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হল:

  • শিশুকে স্বনির্ভরভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করা
  • বিকলাঙ্গতা থাকা সত্ত্বেও শিশুকে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন ও প্রাত্যহিক কাজকর্মে সক্ষম করে তোলা
  • বিকলাঙ্গতার কারণে যেন শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ ব্যাহত না হয় তা সুনিশ্চিত করা
  • কৃত্রিমভাবে শিশুর সামগ্রিক বাহ্যিক প্রকাশ বা রূপ এবং সার্বিক সক্ষমতার উন্নতি ঘটানো
  • শিশুকে তার নিজের যত্ন নেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করা

অপারেশনের পরের প্রয়োজনীয় যত্ন ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা

অপারেশনের অব্যবহিত পরের কিছুদিন সময় শুধু শিশুর জন্য নয়, বরং তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পক্ষেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিকভাবে শিশুকে নিজের খেয়াল রাখা ও সামগ্রিকভাবে স্বনির্ভর করে তোলার ওপর জোর দেওয়া অত্যন্ত জরূরী। কারণ, ছোট বয়সে গড়ে ওঠা অভ্যাসগুলিই সারাজীবনের মত স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। এই অভ্যেস গড়ে তোলার জন্য শিশুর পরিবারের সদস্যরা, বিশেষতঃ তার পিতা মাতা কোনো বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে ফিজিক্যাল থেরাপির সাহায্য নিতে পারেন। তবে এর জন্য অবশ্যই সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া উচিৎ। জন্মগতভাবে বিকলাঙ্গ শিশুকে যথাযথ বিকাশের পরিবেশ দেবার জন্য তার পরিবারের সদস্যদের সহায়তা একান্তভাবে প্রয়োজন। তাকে সঠিক সাহায্য করুন এবং দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন বাধাগুলি নিজে নিজে অতিক্রম করতে উৎসাহিত করুন।

FAQs (জন্মগত বিকলাঙ্গতা প্রসঙ্গে সাধারণতঃ যেসব প্রশ্ন ওঠে)

আমার সন্তানের বিকলাঙ্গ হবার সম্ভাবনা কতখানি?

বর্তমানে প্রতি ১০,০০০ শিশুর মধ্যে ৭.৯ জন শিশু বিকলাঙ্গ হবার সম্ভাবনা দেখা যায়।

আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে কি গর্ভাবস্থায় শিশুর বিকলাঙ্গতা আছে কিনা জানা সম্ভব?

গর্ভস্থ অবস্থায় শিশুর নানারকম শারীরিক ত্রুটি বা অস্বাভাবিকতা আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে জানা যায়। ফলে, এই পদ্ধতিতে জন্মগত বিকলাঙ্গতা আছে কিনা তাও বোঝা সহজেই সম্ভব হতে পারে। কিন্তু অল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে বিকলাঙ্গতা বোঝার জন্য মাতৃত্বের শেষ পর্যায় অব্দি অপেক্ষা করতে হতে পারে। যদিও কিডনি, হার্ট, লিভার ইত্যাদি অঙ্গের দুর্বলতা বা অস্বাভাবিকতা এবং কিছু কিছু শারীরিক বিকৃতি আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে কোনো ভাবেই বোঝা যায় না।

এই জন্মগত বিকলাঙ্গতা কি বংশগত হতে পারে?

৯৫ শতাংশ জন্মগত বিকলাঙ্গতা জিনগত বা বংশগত হয় না। যদিও কিছু কিছু অস্বাভাবিকতা, যেমন হাতে বা পায়ে অতিরিক্ত আঙুল তৈরি হওয়ার মত বিকলাঙ্গতা বংশগত কারণে হতে পারে।

সহায়তা প্রয়োজন?

যোগাযোগ করুন

ধন্যবাদ!

যোগাযোগ করার জন্য ধন্যবাদ! আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনার সাথে যোগাযোগ করব।

দ্রুত উত্তরের জন্য, আপনি ওয়েবসাইটের নীচে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট বোতামটি ব্যবহার করে আমাদের সাথে চ্যাট করতে পারেন।

টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন