ব্রেন টিউমারের প্রকারভেদ

এই পোস্টে পড়ুন: English العربية 'তে

ব্রেন টিউমারের প্রকারভেদ

মস্তিষ্কের কোষগুলি অস্বাভাবিক হারে বিভাজিত হতে থাকলে ব্রেন টিউমারের সৃষ্টি হয়। অনেক সময়, এই অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকা কোষ থেকে সৃষ্ট টিউমার মস্তিষ্কের আশেপাশের অন্যান্য কোষেও ছড়িয়ে পড়ে, এবং এইভাবে টিউমারটি ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ব্রেন টিউমার প্রধানতঃ দুই প্রকার হয়, যেমন:

  • বিনাইন, অর্থাৎ ক্যান্সার বিহীন
  • ম্যালিগন্যান্ট, অর্থাৎ ক্যান্সার আক্রান্ত

 

সাধারনতঃ, টিউমার আশেপাশের অঙ্গে ছড়িয়ে পড়াকে ম্যালিগন্যান্সি বা ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ বলে মনে করা হয়।

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের গবেষণা অনুসারে, এখনো পর্যন্ত ১৩০ প্রকারেরও বেশী ব্রেন টিউমার দেখা যায়। এই বিভিন্ন ধরণের টিউমার তাদের উৎপত্তি স্থলের কোষগুলির প্রকার ও প্রকৃতি অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন নাম ও শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়। এই বিভিন্ন প্রকার ব্রেন টিউমার তাদের আকার, মাপ এবং উৎপত্তি স্থল অনুযায়ী একে অপরের থেকে আলাদা হয়। ব্রেন টিউমারের সর্বাধিক পরিচিত প্রকার গুলি নীচে বর্ননা করা হলো:

গ্লিওমাজ

গ্লিওমা নামক ব্রেন টিউমার মস্তিষ্কের গ্লিয়াল কোষে সৃষ্টি হয়। এই গ্লিয়াল কোষ মানবদেহে স্নায়ুর কার্যক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ৩০ শতাংশের বেশী ব্রেন টিউমার সাধারণত গ্লিওমা জাতীয় ব্রেন টিউমারের আওতায় পড়ে। এবং ৮০ শতাংশের বেশী সময় এই গ্লিওমার ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যান্সার আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে।

মূলতঃ চার ধরণের গ্লিয়াল কোষ টিউমার সৃষ্টির জন্য দায়ী। এই চার প্রকারের গ্লিয়াল কোষের শ্রেণীবিভাগ তাদের প্রকৃতি ও জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুসারে করা হয়। এই কোষগুলির জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে টিউমারের প্রকৃতি ও ক্যান্সারের সম্ভাবনা সম্পর্কে অনুমান করা সম্ভব হয়। এই চার ধরণের গ্লিয়াল সেল বা কোষের বিবরণ নীচে ব্যাখ্যা করা হলো:

১. অ্যাস্ট্রোসাইটোমা

এই ধরণের টিউমার অ্যাস্ট্রোসাইট নামক কোষে উৎপন্ন হয় এবং প্রধানত মস্তিস্ক এবং সুষুম্নাকান্ড (মেরুদন্ড)–এই দুই অংশে দেখা যায়। এই কোষগুলি ধীরে ধীরে ম্যালিগন্যান্ট কোষে পরিণত হয়, অথবা খুব দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেয়ে ক্যান্সার আক্রান্ত হতে পারে। অ্যাস্ট্রোসাইটোমা টিউমারের সাধারণ উপসর্গগুলি হলো খিঁচুনি, মাথা ব্যথা, বমি ভাব ইত্যাদি।

২. এপেনডাইমোমা

এই ধরণের টিউমার সাধারণত মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকাণ্ডে অবস্থিত এপেনডাইমাল কোষ থেকে উৎপন্ন হয়। যেহেতু এই কোষগুলি স্নায়ুতন্ত্রের পুষ্টিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, সেই কারণে এই ধরণের টিউমার হলে স্নায়ুর ভারসাম্য কিছুটা বিঘ্নিত হতে পারে।

৩. অলিগোডেন্ড্রোগ্লিওমা

এই জাতীয় টিউমার অলিগোডেন্ড্রোসাইট নামক কোষে উৎপন্ন হয়। উক্ত কোষগুলি স্নায়ু ও স্নায়ুতন্ত্রের রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই ধরণের টিউমার যে কোনো বয়সে দেখা দিতে পারে। সাধারণত এই টিউমারে আক্রান্ত হলে রোগীর ক্ষেত্রে অত্যধিক শারীরিক ক্লান্তি ও বিকলাঙ্গতা ইত্যাদি উপসর্গ লক্ষ্য করা যায়।

৪. জাইলোব্লাস্টোমা

জাইলোব্লাস্টোমা জাতীয় টিউমার অ্যাস্ট্রোসাইট নামক কোষ থেকেই উৎপন্ন হয়। কিন্তু অ্যাস্ট্রোসাইটোমা টিউমারের তুলনায় অনেক বেশি গুরুতর হয়। এই টিউমারে ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যান্সার আক্রান্ত হবার সম্ভাবনাও অনেক বেশি হয়। ছোটদের তুলনায় পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যেই এই টিউমারের সম্ভাবনা অধিক দেখা যায়।

ক্রেনিওফ্যারিঞ্জিওমা

ক্রেনিওফ্যারিঞ্জিওমা হলো এক ধরনের ব্রেন টিউমার যা খুলির গোড়ার অংশে বা সুষুম্নাকান্ডের নিম্নভাগে অত্যন্ত ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের মধ্যে এই ধরণের টিউমারে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা সর্বাধিক হয়। তবে এই ধরণের টিউমার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিনাইন বা ক্যান্সার মুক্ত হয়ে থাকে। মোট ব্রেন টিউমারের মাত্র ২ শতাংশ ক্রেনিওফ্যারিঞ্জিওমা শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে।

মেডুলোব্লাস্টোমা

মেডুলোব্লাস্টোমা এক ধরণের ম্যালিগন্যান্ট ব্রেন টিউমার। এই প্রকার ব্রেন টিউমার প্রধানতঃ পূর্ণবয়স্কদের তুলনায় ৪ থেকে ১০ বছরের শিশুদের মধ্যে বেশি লক্ষ্য করা যায়। এই প্রকার টিউমার সাধারণত মস্তিষ্কের সেরিবেলাম অংশে দেখা যায়। এবং এর নামকরণ মেডুলা নামক অংশের নাম অনুযায়ী করা হয়। এই মেডুলা মস্তিষ্ক এবং সুষুম্নাকান্ডের উপরিভাগের সংযোগকারী একটি অংশ। মেডুলোব্লাস্টোমা নামক টিউমার নিজের উৎপত্তি স্থল থেকে ক্রমশঃ সুষুম্নাকান্ড ধরে দেহের নীচের দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

মেনিনজিওমা

মেনিনজিওমা এক ধরনের সাধারণ ব্রেন টিউমার যা করোটির অন্তঃস্থলে উৎপন্ন হয়। এই জাতীয় টিউমার সাধারনত বিনাইন হয় এবং সমস্ত প্রকার টিউমারের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ টিউমার মেনিনজিওমা শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে মেনিঞ্জেস নামক অংশ, যা প্রকৃতপক্ষে একটি পর্দার মত, সেই স্থল থেকে এই মেনিনজিওমা টিউমারের উৎপত্তি হয়। ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যান্সার আক্রান্ত মেনিনজিওমা খুবই বিরল প্রজাতির টিউমার।

পিটুইটারি অ্যাডিনোমা টিউমার

গ্লিওমা টিউমারের পরেই পিটুইটারি অ্যাডিনোমা টিউমারই হলো সর্বপেক্ষা সাধারণ প্রজাতির ব্রেন টিউমার। এই টিউমারটিও করোটির অন্তঃস্থলে উৎপন্ন হয় এবং ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বাধিক পরিলক্ষিত হয়। কিছু কিছু বিরল ঘটনায় এই ধরণের টিউমার শিশুদের মধ্যেও দেখা যায়। কিন্তু আশার কথা হল এই যে এই জাতীয় টিউমার সহজেই অপারেশনের মাধ্যমে নিরাময় করা যায়। বেশিরভাগ পিটুইটারি অ্যাডিনোমা টিউমারই বিনাইন প্রকৃতির হয়। যদি এই টিউমার ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যান্সার আক্রান্ত হয়েও পড়ে , তা সাধারণত দেহের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে না। অর্থাৎ, এই জাতীয় টিউমারের ক্ষেত্রে মেটাস্টেসিসের ঘটনা খুবই বিরল।

হিমাঞ্জিওব্লাস্টোমা

হিমাঞ্জিওব্লাস্টোমা নামক টিউমার অত্যন্ত ধীরে বৃদ্ধি পায়। নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যেই এই ধরণের টিউমারের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। সাধারনত মস্তিষ্কের সেরিবেলাম অংশের রক্তজালিকা থেকে এই প্রকার টিউমারের উৎপত্তি হয়। ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের মধ্যে এই টিউমারের প্রকোপ বেশি লক্ষ্য করা যায়। হিমাঞ্জিওব্লাস্টোমা সাধারণত বড় আকারের হয়, এবং এই রোগে টিউমার হতেও পারে, বা নাও পারে।
উপরিউক্ত টিউমারের প্রকারভেদ ছাড়াও নানা রকম ব্রেন টিউমার দেখা যায়। বিস্তারিত জানার জন্য আপনার সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পরামর্শ দেবেন, যার মাধ্যমে টিউমারের সঠিক অবস্থান, আকার, কারণ, জটিলতা, টিউমারটি ম্যালিগন্যান্ট কি না এবং তার নিরাময় হবার সম্ভাবনা কতখানি, এসবই সবিস্তারে জানা সম্ভব।

সহায়তা প্রয়োজন?

যোগাযোগ করুন

ধন্যবাদ!

যোগাযোগ করার জন্য ধন্যবাদ! আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনার সাথে যোগাযোগ করব।

দ্রুত উত্তরের জন্য, আপনি ওয়েবসাইটের নীচে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট বোতামটি ব্যবহার করে আমাদের সাথে চ্যাট করতে পারেন।

টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন